anis-coquelet-LanJEVFzxPw-unsplash

নিয়ামত শব্দের তাফসির

নিয়ামত শব্দটি মোটামুটি সবার কাছেই পরিচিত শব্দ। আরবী এই শব্দটি ব্যবহারের আধিক্যতায় এখন বাংলা শব্দের গোত্রভুক্ত হয়ে গেছে বলা যায়। এই শব্দের অর্থের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত ভাষাবিদ ইবনু ফারিস লিখেছেন, 

‘নূন, আইন ও মীম—এই তিন অক্ষর থেকে গঠিত শব্দের শাখা-প্রশাখা অনেক। কিন্তু এত বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও এগুলো একটি মূল অর্থের দিকেই ফিরে যায়। আর তা হলো সচ্ছলতা, সুখময় জীবন ও কল্যাণ।

এ থেকেই নিয়ামত (النِّعْمَةُ) শব্দের উৎপত্তি। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে যে সম্পদ ও জীবনযাপনের সুযোগ-সুবিধা দান করেন এর সবকিছুকেই নিয়ামত বলা হয়। ইকার যোগে ‘নিয়ামাহ’ (النِّعْمَةُ) অর্থ অনুগ্রহ বা দান; আবার আকার যোগে ‘নাআমা’ও (النَّعْمَةُ) একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। (ইবনু ফারিস, মুজামু মাকায়িসিল লুগাহ: ১৩৭)

ইবনু ফারিস রাহ. যদিও বলেছেন ‘নিয়ামাহ’ (النِّعْمَةُ) ও ‘নাআমা’ (النَّعْمَةُ) একই অর্থে ব্যবহৃত হয়, তবে কুরআনী ব্যবহারে উভয়ের মধ্যে সামান্য পার্থক্য আছে। তা হলো, 

▪️ (النِّعْمَةُ) — নূনের নিচে যের

এটি হলো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ ও দান, যা তারা তাঁর আনুগত্য ও ইবাদতে ব্যবহার করে। এ ধরনের নিয়ামত অনেক রকম হতে পারে। যেমন: সুস্থতা, শক্তি, ঈমান ইত্যাদি। 

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

وَإِن تَعُدُّواْ نِعْمَتَ اللّهِ لاَ تُحْصُوهَا
“তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও, তবে তা গণনা করতে পারবে না।” (সূরা আন-নাহল: ১৮)

▪️ (النَّعْمَةُ) — নূনের উপরে যবর

এটি বোঝায় এমন ভোগ-বিলাস, আরাম-আয়েশ ও সচ্ছলতা, যা আল্লাহর অবাধ্যতায় ব্যবহৃত হয়। ফলে নূন এর মধ্যে যবর দিয়ে ‘নাআমাহ’ শব্দটি এসেছে নিন্দনীয় ক্ষেত্রে। 

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

وَذَرْنِي وَالْمُكَذِّبِينَ أُولِي النَّعْمَةِ وَمَهِّلْهُمْ قَلِيلًا

“আর আমাকে ও মিথ্যারোপকারীদের ছেড়ে দাও—যারা ভোগ-বিলাসে মত্ত; আর তাদের কিছু সময় অবকাশ দাও।” (সূরা আল-মুয্জাম্মিল: ১১)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, 

وَنَعْمَةٍ كَانُوا فِيهَا فَاكِهِينَ

“এবং সেই ভোগ-বিলাসে, যার মধ্যে তারা আনন্দে মত্ত ছিল।”
(সূরা আদ-দুখান : ২৭)

সারকথা হলো,  কুরআনে যবর-যোগে নাআমাহ (النَّعْمَةُ) শব্দটি কল্যাণের অর্থে আসেনি; বরং নিন্দার প্রেক্ষাপটে এসেছে। আর যের যোগে নিআমাহ (النِّعْمَةُ)—এর সব ব্যবহারই কল্যাণ ও উত্তম অর্থে এসেছে।

পবিত্র কুরআনে ‘নিয়ামত’ শব্দটি কখনও খোলা ‘তা’ (نعمت) আবার কখনও গোল ‘তা’ (نعمة) দিয়ে লেখা হয়েছে। এটি কোনো বানানগত অসঙ্গতি নয়; বরং কুরআনের ভাষাগত অলৌকিকতার এক সূক্ষ্ম নিদর্শন। শব্দের এই ভিন্ন লিখনরীতির মাধ্যমে অর্থের গভীরতা ও প্রসঙ্গভেদে তাৎপর্যের পার্থক্য ফুটে উঠেছে।

কুরআনের বর্ণনাশৈলীর একটি বৈশিষ্ট্য হলো, যখন কোনো নিয়ামত মানুষের সামনে উপস্থিত, দৃশ্যমান বা সরাসরি অনুভবযোগ্য হয়ে থাকে, তখন সেখানে সাধারণত খোলা ‘তা’ (نعمت) ব্যবহার করা হয়েছে । এতে বোঝানো হয়, নিয়ামতটি যেন মানুষের সামনে উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে, যখন নিয়ামতটি অদৃশ্য, সাধারণ আলোচনা, কিংবা ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সম্পর্কিত, তখন ব্যবহৃত হয়েছে গোল ‘তা’ (نعمة) দিয়ে। এটি ইঙ্গিত করে যে নিয়ামতটি এখনো মানুষের দৃষ্টির আড়ালে, অথবা তা ব্যাপক ও সামগ্রিক অর্থ বহন করছে।

উদাহরণস্বরূপ, সূরা ইবরাহীমে আল্লাহ তাআলা বলেন, 

 وَآتَاكُم مِّن كُلِّ مَا سَأَلْتُمُوهُ ۚ وَإِن تَعُدُّوا نِعْمَتَ ٱللَّهِ لَا تُحْصُوهَا ۗ إِنَّ ٱلْإِنسَـٰنَ لَظَلُومٌ كَفَّارٌ

“তিনি তোমাদেরকে তোমরা যা কিছু চেয়েছ তা থেকে দান করেছেন। তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও, তা কখনো গুণে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয়ই মানুষ অত্যন্ত জালিম ও অকৃতজ্ঞ।” (সূরা ইবরাহীম : ৩৪)

এখানে نِعْمَتَ শব্দটি খোলা ‘তা’ দিয়ে এসেছে। কারণ এখানে মানুষের সামনে বিদ্যমান, প্রত্যক্ষ ও অনুভবযোগ্য নিয়ামতের কথা বলা হয়েছে, যা দেখেও মানুষ অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

অন্যদিকে সূরা আন-নাহলে বলা হয়েছে, 

 وَإِن تَعُدُّوا نِعْمَةَ ٱللَّهِ لَا تُحْصُوهَا ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ 

“তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও, তা কখনো গুণে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (আন-নাহল : ১৮)

এখানে একই বাক্য হওয়া সত্ত্বেও نِعْمَةَ শব্দটি গোল ‘তা’ দিয়ে এসেছে। কারণ এখানে নিয়ামতের একটি ব্যাপক ও সাধারণ বর্ণনা এসেছে, যার মধ্যে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উভয় নিয়ামতই অন্তর্ভুক্ত।

দৃশ্যমান নিয়ামতের আরেকটি উদাহরণ সূরা আলে ইমরানে আছে,  وَٱذْكُرُوا نِعْمَتَ ٱللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَآءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ 

“তোমরা আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের অন্তরে সম্প্রীতি স্থাপন করেন।” (আলে ইমরান : ১০৩)

এখানে আউস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে শত্রুতা দূর করে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মতো একটি বাস্তব ও দৃশ্যমান নিয়ামতের প্রসঙ্গে نِعْمَتَ (খোলা ‘তা’) ব্যবহৃত হয়েছে।

একইভাবে সূরা আল-মায়েদাহতে বলা হয়েছে, 

 يَا أَيُّهَا ٱلَّذِينَ آمَنُوا ٱذْكُرُوا نِعْمَتَ ٱللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ هَمَّ قَوْمٌ أَن يَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ فَكَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنكُمْ। 

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন এক সম্প্রদায় তোমাদের প্রতি হাত বাড়াতে উদ্যত হয়েছিল, কিন্তু তিনি তাদের হাত তোমাদের থেকে ফিরিয়ে দেন।” (আল-মায়েদাহ : ১১)

এই আয়াতে খোলা ‘তা’ ব্যবহৃত হয়েছে। কারণ শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া ছিল প্রত্যক্ষ ও অনুভবযোগ্য নিয়ামত। 

সূরা ফাতিরে বলা হয়েছে, 

 يَا أَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱذْكُرُوا نِعْمَتَ ٱللَّهِ عَلَيْكُمْ ۚ هَلْ مِنْ خَـٰلِقٍ غَيْرُ ٱللَّهِ يَرْزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلْأَرْضِ 

“হে মানুষ! তোমরা আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করো। আল্লাহ ছাড়া কি আর কোনো স্রষ্টা আছে, যে তোমাদেরকে আসমান ও জমিন থেকে রিযিক দান করে?” (সূরা ফাতির : ৩)

এখানেও দৃশ্যমান নিয়ামতের প্রসঙ্গে نِعْمَتَ ব্যবহৃত হয়েছে।

অন্যদিকে অদৃশ্য বা ভবিষ্যৎ নিয়ামতের ক্ষেত্রে গোল ‘তা’ ব্যবহারের উদাহরণ দেখা যায় সূরা আলে ইমরানে, 

 يَسْتَبْشِرُونَ بِنِعْمَةٍ مِّنَ ٱللَّهِ وَفَضْلٍ 

“তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নিয়ামত ও অনুগ্রহে আনন্দিত হয়।” (আলে ইমরান : ১৭১)

এখানে শহীদদের জন্য পরকালে সংরক্ষিত নিয়ামতের কথা বলা হয়েছে, যা বর্তমানে অদৃশ্য; তাই بِنِعْمَةٍ (গোল ‘তা’) ব্যবহৃত হয়েছে। 

ভাষাগত ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকেও এই একই শব্দকে দুই বানানে লেখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ। আধুনিক আরবী বানানের নিয়ম অনেক পরে প্রণীত হয়েছে। কিন্তু কুরআনের লিখন তখনকার আরবের বিশুদ্ধ উপভাষার নিয়ম অনুসারে লেখা হয়েছে। কিছু আরব গোত্র নারী-লিঙ্গ নির্দেশক শব্দে খোলা ‘তা’ ব্যবহার করত। তাই একই শব্দকে দুই বানানে লেখার মাধ্যমে কুরআনে গোল ‘তা’ এর পাশাপাশি খোলা ‘তা’-এর ব্যবহারটিও সংরক্ষিত হয়েছে।

Share:

Facebook
Twitter
Pinterest
LinkedIn

জনপ্রিয় ব্লগ

Uncategorized

হিফজ জার্নি: কুরআনের সাথে সম্পর্কের এক অনন্য গল্প

আজ আমি আপনাদেরকে শোনাব আমার দীর্ঘ পাঁচ বছরের হিফজ জার্নির গল্প। আমার এই অভিজ্ঞতা শেয়ার করার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো— কুরআনের

পুরোটা পড়ুন