আজ আমি আপনাদেরকে শোনাব আমার দীর্ঘ পাঁচ বছরের হিফজ জার্নির গল্প। আমার এই অভিজ্ঞতা শেয়ার করার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো— কুরআনের সাথে বন্ধুত্ব করতে এবং এর সাথে সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলতে আপনাদেরকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করা।
হিফজের সূচনা
আমি আয়েশা মাহমুদা। আলহামদুলিল্লাহ, চল্লিশোর্ধ বয়সে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে কুরআন হিফজ শুরু করি এবং পঁয়তাল্লিশ বছর পার হওয়ার পর তা সম্পন্ন করি। সাধারণত আমাদের সমাজে দেখা যায়, মা-বাবা ছোট সন্তানদের হাফেজ বানানোর জন্য সব ব্যবস্থা করেন। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর হিফজ শুরু করার ক্ষেত্রে আমার বিষয়টি আলাদা ছিল। পরিবার বা বাইরের কেউ আমাকে হিফজ করার জন্য উৎসাহ দেয়নি, বরং অনেকেই অবাক হতেন। তবে ‘আর-রহমান’, যিনি কুরআন শিখিয়েছেন, তিনি নিজেই আমার অন্তরে এই মহৎ কাজের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আল-কুরআনের সেই অমিয় বাণীই ছিল আমার পথের পাথেয়:
وَمَن يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ
“যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে, তিনি তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন।” (সূরা আত-তাগাবুন: ১১)
নূরুল কুরআন একাডেমিতে আসার গল্প
সব সময় আমার মনে কুরআন মুখস্থ করার এক প্রবল আকাঙ্ক্ষা কাজ করত। ২০২০ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেখি, যেখানে হিফজ করতে আগ্রহীদেরকে মন্তব্য করতে বলা হয়েছিল। আমি দেরি না করে সেখানে আমার আগ্রহের কথা জানাই। এরপর ২০২০ সালের মে মাসে একটি একাডেমিতে হিফজ শুরু করি।
যাত্রার শুরুটা মসৃণ হলেও দু’মাস পর উস্তাযা চলে যাওয়ায় আমি একাডেমির প্রধান উস্তাযাকে পড়া দিতে শুরু করি। এভাবে সূরা বাকারাহর ২০৭ নম্বর আয়াত পর্যন্ত হিফজ সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে একজন নতুন উস্তাযা নিযুক্ত হন। প্রথম দিন পড়া দেওয়ার সময় উস্তাযার ইন্টারনেটে অনেক সমস্যা ছিল, যার ফলে আমাদের কথা একে অপরের কাছে স্পষ্ট ছিল না। তিনি আমাকে সূরা ফাতিহা শুনাতে বললেন। আমি পাঠ করলাম, কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তিনি সম্ভবত ঠিকমতো শুনতে পাননি। পড়া শেষে উস্তাযার মন্তব্য ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক—তিনি বললেন, “আমি যা পড়েছি সব ভুল পড়েছি।”
এই কথাটি শোনার পর আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি এবং টানা দু’দিন অনেক কেঁদেছি। আমার মনে শুধু একটিই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল— “তবে কি আমার আর হিফজ করা হবে না?” যদি আমি অশুদ্ধই পড়ে থাকি, তবে আগের উস্তাযারা আমাকে এতদূর কেন মুখস্ত করতে দিলেন?
সেই চরম হতাশা ও কান্নাকাটির সময় আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমার ডাক শুনলেন। হঠাৎ আমার নূরুল কুরআন একাডেমির কথা মনে পড়ে গেল। পূর্বের একাডেমিতে থাকাকালীনই ফেসবুকে উস্তায আব্দুল্লাহ আল মাসউদের পোস্ট থেকে এই একাডেমির কথা জেনেছিলাম। উস্তাযের বই পড়ে এবং ফেসবুকে তাঁকে অনুসরণ করার সুবাদে তাঁর প্রতি আমার আগে থেকেই অগাধ আস্থা ও সুধারণা ছিল। তখন মনে হয়েছিল, উনার প্রতিষ্ঠান নিশ্চয়ই খুব ভালো হবে। কিন্তু যেহেতু আমি অন্য জায়গায় পড়ছিলাম, তাই তখন আর সেখানে ভর্তি হওয়া সম্ভব হয়নি।
এখন বুঝতে পারি, আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমার হিফয সম্পন্ন করার জন্য ‘নূরুল কুরআন একাডেমি’কেই নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। দিশেহারা হয়ে আমি একাডেমিতে মেসেজ পাঠিয়ে আমার ইচ্ছার কথা জানাই। এরপর আগস্টের এক শুক্রবারে উস্তাযা উম্মু মুমতাহিনা আমাকে ফোন করেন। তিনি আমার তিলাওয়াত শুনলেন এবং আশ্বস্ত করলেন যে, আমি ইনশাআল্লাহ হিফজক করতে পারব।
অবশেষে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমি এই একাডেমিতে ভর্তি হই। দীর্ঘ সাধনার পর, আলহামদুলিল্লাহ, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আমি প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ শেষ করি।
হিফজের পথে বাঁধা ও প্রতিবন্ধকতা
এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া সহজ ছিল না। আমি বেশ কিছু বাঁধার সম্মুখীন হয়েছি। সেগুলো হলো-
এক. সামাজিক অবিশ্বাস: এই বয়সে সম্পূর্ণ কুরআন হিফজক করা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতো। অনেকের কথা শুনে মনে হতো আমি এক অসম্ভব কাজ করছি। মানুষ উৎসাহ দেওয়ার পরিবর্তে বিস্ময়ে চুপ হয়ে যেত।
দুই. মনোযোগ ধরে রাখা: সংসার, স্বামী, সন্তান এবং চারপাশের নানাবিধ ব্যস্ততার মাঝে শুধুমাত্র কুরআনের দিকে মনোযোগ ধরে রাখা ছিল অনেক কঠিন।
তিন. শারীরিক অসুস্থতা: হিমোগ্লোবিন এবং ভিটামিন-ডির ঘাটতির কারণে প্রায়ই ক্লান্তি ও মাথা ব্যথায় ভুগতাম। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় পড়তে পারতাম না।
চার. পরিবেশের অভাব: প্রবাসে ছুটির দিনে বাসার সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকত, তখন পড়া চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। কোথাও বেড়াতে গেলে বা দাওয়াত থাকলে পরবর্তী কয়েকদিন ক্লান্তি পিছু ছাড়ত না।
আমার নিরন্তর চেষ্টা
আমার শুধু মনে হতো—আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাকে একটি নিয়ামত, একটি উপহার দিতে চান। আর আমি সেই উপহার নেওয়ার জন্য সামান্য চেষ্টা করব না? তাই নিজেকে সব সময় হিফজের সাথে যুক্ত রাখতাম। আমি যে কাজগুলো করতাম তা হলো-
• নিয়মিত পড়া দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা।
• প্রতিদিন ফজরের পর পড়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা।
• পড়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ফোনে কথা বলা বা অন্য কাজে ব্যস্ত না হওয়া।
• সামাজিক আড্ডা, দাওয়াত বা দীর্ঘ ফোনালাপ কমিয়ে দেওয়া।
হিফজের জন্য আবশ্যক পাঁচটি বিষয়
১. শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করতে জানা। ২. সহীহ নিয়্যত। ৩. সুদৃঢ় ইচ্ছা ও সংকল্প। ৪. আল্লাহর কাছে একান্ত দুআ। ৫. ক্রমাগত চেষ্টা।
শেষ কথা
আমরা মায়েরা শুধু সন্তানের শিক্ষার কথাই ভাবি, নিজেদের কথা ভুলে যাই। কিন্তু পরকালে প্রত্যেককে নিজস্ব আমলনামা নিয়ে রবের সামনে হাজির হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ ٣٤ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ ٣٥ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ
“সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভ্রাতার কাছ থেকে, তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে।” (সূরা আবাসা: ৩৪-৩৬)
আসুন, আমরা সবাই কুরআনের সাথে বন্ধুত্ব করি, সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলি। যাতে সেই ভয়াবহ দিবসে যখন আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনকে বাকশক্তি দিবেন, তখন কুরআন আমাদের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ ﴿٦٩﴾
“যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে আছেন।” (সূরা আনকাবুত: ৬৯)
ওয়া আখিরু দাওয়ানা আনিল আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল ‘আলামিন।
লক্ষ্য করুনঃ আরেকজন ছাত্রীর হিফজ জার্নি পড়তে চাইলে ক্লিক করুন এখানে
যারা হিফজ করা শুরু করেছেন বা করবেন বলে ভাবছেন তারা চাইলে আমাদের প্রিরেকর্ডেড কোর্স ‘হিফজ নির্দেশিকা কোর্স’টি করে নিতে পারেন। এর মাধ্যমে আপনি কীভাবে সঠিক পন্থায় হিফজের পথে অগ্রসর হবেন সেই বিষয়ে একটি পরিষ্কার গাইডলাইন পপাবেন ইনশাআল্লাহ। কোর্সটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন এখানে
আমাদের একাডেমিতেও দীর্ঘ মেয়াদে হিফয করতে পরেন। আমাদের ‘হিফজুল কুরআন কোর্স’ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন এখানে
আপনি চাইলে শুধু ৩০ নং পারাও (আম্মা পারা) হিফজ করতে পারেন। এর জন্য রয়েছে আমাদের ‘৩০ নং পারা হিফজ কোর্স’। এই কোর্স’ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন এখানে
যেসব মাধ্যমে আমাদেরকে ফলো করে একাডেমির কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত আপডেট পেতে পারেন –
টেলিগ্রাম চ্যানেল- https://t.me/nlquran
ফেসবুক পেইজ- www.facebook.com/NLQURAN
ফেসবুক গ্রুপ- https://web.facebook.com/groups/nlquran
